উৎকণ্ঠা
This story is about a teenager who is struggling with mental health issues. I add elements from my knowledge of Psychology, Freud's and Carl Jung's dream interpretation, and mythology. Given dream symbols of the first paragraph reflect the main character's unconscious repressed emotions.
গভীর রাতে আরমান নিজেকে ব্যাঙ হিসেবে আবিষ্কার করলো। পূর্ণিমা রাতে আরমানের ছায়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যা দেখতে পাখির ছায়ার মতো। জায়গাটার সাথে আরমান একদম পরিচিত না। পেছনে ফিরে সে দেখলো নদীর ধারে আখের ক্ষেতে একটি কালো বিড়াল তার দিকে তাকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। তৎক্ষণাৎ বিড়ালটি আরমানকে ধাওয়া করলো। কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে আরমান কুয়ার মধ্যে লাফ দিলো। আরমানের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে। ঘর্মাক্ত শরীরে সে নিজেকে আবিষ্কার করলো। সে বুঝতে পারলো এটি কেবলই ছিল একটি দুঃস্বপ্ন।
বর্ষার সকাল। রিমঝিম বৃষ্টি আরমানের মনে সবসময় আলাদা ছাপ ফেলে। হরেক রকমের অনুভূতি ছুয়ে যায় তাকে। কখনো বিষন্নতা ঘিরে ধরে আবার কখনো শৈশবের সুখস্মৃতি মেঘ হয়ে মনের আকাশে বয়ে বেড়ায়। আরমানের বয়স এখন সতেরো। তার বাবা-মা দুজনই দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার। মাস দুয়েক হলো তাকে কোলবালিশ ছাড়াই ঘুমোতে হচ্ছে। সেদিন তার মা আশেপাশে তাকিয়ে তাকে হটাৎ করে বললো, 'মনে হচ্ছে তোকে খুব শীঘ্রই বিয়ে দিতে হবে। আর আজকে থেকে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমানো নিষেধ।' পাশের রুম থেকে তার বাবা চিৎকার দিয়ে উঠলো, 'কতদিন থেকে বলছি ভাত বেশী খাওয়াও, ভাত বেশী খাওয়াও। ছেলোটার মুখ শুকিয়ে দাঁত বের হয়ে যাচ্ছে। আমি তো ওর শত্রু। ভালো কথা বললে খারাপ হয়ে যায়।' আরমানের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলোনা। চাপা কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে বয়ে পড়লো টপটপ করে। আরমান ভাবতে থাকে স্বপ্নদোষ শব্দটা স্বপ্নদোষ না হয়ে অন্য কিছু হলে ভালো হতো। অন্ডকোষের স্বাভাবিক ক্রিয়া কিভাবে দোষ হতে পারে। নৈশকালীন নির্গমন ছাড়াও আরে সুন্দর শব্দ অভিধানে আছে যেটি এই ব্যাপারটির অর্থ বহন করে। কিন্তু স্বপ্নদোষ মানুষের মুখে বেশী প্রচলিত। কারো জন্য সাত ফোঁটা রক্তের প্রবচন আর কারো জন্য স্যাকিউবাস পিশাচীনির স্বপ্নে আগমন।
আরমানের জীবনটা অনেক বৈচিত্র্যময়। এক বছর আগে ছেলেটার ওজন সেঞ্চুরি পার করেছিল। কোলোস্টোরেলের মাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছিলো। ওজন নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো তার বাবাকে সামলানো। তার বাবার জন্য পরিমিত খাবার হচ্ছে সেই খাবার যেখানে দশ ভাগ থাকবে মাছ অথবা মাংস, ত্রিশ ভাগ থাকবে সবজি আর বাকি ষাট ভাগ থাকতে হবে ভাত। আরমানের দাদু মাঝেমধ্যেই দারিদ্রতার জন্য অনাহারে থাকার দিনগুলো নিয়ে গল্প আরমানকে শোনাতো। শৈশবে অনাহারে থাকার ট্রমা তার বাবা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখন যদিও তার পরিবারের অনাহারে থাকতে হয়না তবুও অনাহারে থাকার ভয় তাকে এখনো তাড়া করে। আরমানকে পরিমিত পরিমানে খেতে দেখলে তার বাবার মেজাজ বিগড়ে যায়। এরপরেও কঠোর অধ্যবসায়ে আরমান ওজন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার পরেও আরমান খুশী থাকতে পারছিল না কারণ তার বাবা-মা এর মনে হচ্ছিলো তাদের অযত্নে ছেলেটি শুকিয়ে গিয়েছে। আরমানের ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্ট থাকায় বাবার খামারের কালো গরুর দুধ তার পেটে হজম হয়না। এরপরেও ছেলের দুধ না খেতে চাওয়া তার বাবা মা কে কষ্ট দেয়। তাদের কাছে এটা ভালেবাসার অবমূল্যায়ন। আরমানের মনে হয় ট্রমার কারণে তার বাবার মস্তিষ্কের অ্যামাইগডালা সবসময় সক্রিয় থাকে। তাই হয়তো যখনতখন তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়।
আরমানের দাদু মারা যাবার পর থেকে আরমান তার কষ্টের কথাগুলো কাউকে বলার মতো ভরসা পায়না। সে শুধু তার দাদুর সাথেই তার মনের কথাগুলো শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। সময়টা ছিলো বর্ষাকাল। আরমানের দাদু যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তখন বাইরে অনেক বৃষ্টি ছিল। তখন থেকে বৃষ্টি আরমানের মনকে বিষন্ন করে তোলে। বৃষ্টির সাথে সাথে ঝরতে থাকে অশ্রু। যদিও সব কথা শেয়ার করা হতোনা। স্কুলে আরমান প্রচুর বুলিং এর শিকার হয়। বুলিং এর ব্যাপারে কাউকে বলতে সে ভয় অনুভব করে। হাতের বাইরে থাকা বিষয়গুলো গ্রহণ করতে না পারায় সে হীনমন্যতায় ভোগে। টিফিন টাইমে জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবে, 'আমি হয়তো যথেষ্ট ভালো নই যার কারণে আমি বুলিং এর শিকার হই' ' 'শিক্ষকদের অভিযোগ করলে যদি সবার কাছে ছোট হই?' 'বাবা মা কে বললে তারা ওদের শাসাবে কিন্তু এরপর ওরা স্কুলের বাইরে আমার ক্ষতি করবেনা তো?' মাথার ভিতর এই অগোছালো চিন্তাগুলো আরমানকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
আরমান অনেকবার তার বাবাকে বলেছে তার হয়তো সাইকিয়াট্রিস্টের সাহায্যের প্রয়োজন। তখন তার বাবার ভাষ্য থাকে, 'তুমি কি পাগল? তুমি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবা কেনো? একটা ঘুম দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।' আরমানের বেড়ে ওঠা অন্যান্য স্বাভাবিক ছেলেমেয়েদের মতো না। ছোটবেলায় ডিসলেক্সিয়া থাকার কারণে কোনোকিছু শেখা আরমানের জন্য অন্যদের তুলনায় কঠিন ছিলো। তার বাবা মা এবং স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে এই রোগ সম্পর্কিত জ্ঞান না থাকায় তাদের দ্বারা অনেক শারীরিক ও মানসিকভাবে আরমান নির্যাতিত হয়। অমানবিক নেতিবাচক চিন্তা অনেকসময় তাকে কাবু করার চেষ্টা করলেও সেই লড়াইয়ে আরমান কখনো পরাজিত হয়নি। দাদুর কাছ থেকে শোনা গল্পগুলো থেকে বেশ কিছু নৈতিক শিক্ষা আরমানের অবচেতন মনে গেঁথে আছে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। অস্তায়মান সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে সব দিকে। সূর্য ডোবার আগেই আরমানের ঘরে ফেরার কথা। আকাশ দেখার জন্য ছাদে যাবে বলে বাইরে বের হয়েছিলো। মায়ের চোখ হঠাৎ পড়ার টেবিলের দিকে পড়লো। চোখ ফেরানোর সাথে সাথে সে একটি ছেঁড়া কাগজ দেখতে পেলো। কাগজটি হাতে নিতেই টপটপ করে পড়া শুরু করলো মায়ের অশ্রু কারণ শিরোনামে সে দেখতে পেয়েছে সুইসাইড নোট লেখা।
' মা এবং বাবা, আমার জন্য তোমাদের ত্যাগ তিতিক্ষা কখনো লিখে শেষ করা যাবে না। ছোটবেলায় আমার অসুস্থতার সময় রাতের ঘুম ত্যাগ করে তোমরা আমার সেবায় রজনী যাপন করেছো। আমাকে ভালো রাখার জন্য তোমাদের প্রচেষ্টায় কমতি ছিলোনা। তোমাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কালকে গরুর দুধ খায়নি বলে রাগের মাথায় যে কথাগুলি বললে সেগুলো আসলেই সত্যি। আমি আসলেই তোমাদের কখনো গর্বিত করতে পারিনি। সমাজে মাথা উঁচু করে চলার পথে বাঁধা হয়েছি। আমি চলে গে।'
আশ্চর্যজনকভাবে লিখাটি এখানেই সমাপ্ত হলো। লিখাটি পড়ে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে আরমানের বাবা-মা আরমানকে বাইরে খুঁজতে বের হলো। আরমান সচরাচর যেসব জায়গাগুলোতে ঘুরতে বের হতো সব জায়গায় তাকে খোঁজা হলো। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। এইদিকে আরমানের ফোন ও বন্ধ। রাত নয়টার আশেপাশে হঠাৎ একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসলো। আরমানের পরিবারের উৎকণ্ঠা তখন আকাশ ছুঁয়ে গেলো। সাহস করে আরমানের মামা ফোনটি ধরলো। 'হ্যালো, আপনি কি আরমানের অভিভাবক?' 'হ্যাঁ, আমি আরমানের মামা।' 'আরমান আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আছে। আমি আপনাদের ঠিকানা ম্যাসেজ করে দিচ্ছি। আপনারা চলে আসুন। আপনাদের সাথে ডাক্তার দেখা করতে চায়।'
দুই দিন আগের ঘটনা। দুধ খাওয়া নিয়ে আরমানের সাথে তার বাবার ঝামেলা বাঁধে। ঐ সময় তার বাবা আরমানের জন্মগত ত্রুটি এবং প্রতিকূলতাগুলো নিয়ে তার মাকে এবং তাকে অসম্ভব রকমের বাজে ভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে। সে কথাগুলো আরমানকে এতটাই মানসিকভাবে আঘাত করেছিলো যে আরমানের প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়। আরমান বুকে চাপ অনুভব করতে থাকে। হাত-পা কাঁপতে থাকে। ঐ রাতে আরমান এক ঘন্টার বেশি ঘুমোতে পারেনি। নেতিবাচক চিন্তার সমুদ্রে সে ডুবে গিয়েছিল। নিজেকে বোঝা মনে হচ্ছিলো তার। সেখান থেকেই আত্মহত্যাকেন্দ্রিক চিন্তা তার মাথায় বারবার ঘুরছিল। সুইসাইড নোটও লিখা শুরু করেছিল কিন্তু লিখার মাঝখানে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়েছিল। সুইসাইড নোট লেখার সময় সে দিবা স্বপ্নে নিজেকে আগুনে পোড়া অবস্থায় দেখতে পেয়েছিল। ছাদে উঠে সে একবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল আরেকবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল। অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবার পর সে নিজেকে বললো, ' এই মুহূর্তে আমি যতটাই খারাপ অনুভব করি না কেন আমি সবসময় এমন অনুভব করবোনা। এই পৃথিবীতে কোন কিছুই স্থায়ী নয়। খারাপ দিনগুলো না থাকলে কি ভালো দিনগুলোর মহত্ব থাকতো?' কিন্তু আরমান তার বাবার কথাগুলো কোনোভাবেই প্রসেস করতে পারছিল না। বাসায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছেটাও একদমই কাজ করছিল না। এই দ্বন্দ্ব ক্রমশ সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছিলো। আরমান নিচে নেমে একটি সিএনজি ভাড়া করলো। একটি টাকাও তার পকেটে ছিলো না। বেঁচে থাকার অপার আকাঙ্ক্ষা তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিলো।